কেন?

এই যে দুনিয়ায় কতো কি হচ্ছে
কতো আরও হবে, হয়েছিলো আরও কতো
সেই সকল ঘটনার বিবরণ
আছে আমাদের সকলের স্মরণ।
কি হচ্ছে, কি ভাবে হচ্ছে
কোথায় কি হচ্ছে
সব খবরই রাখি আমরা।
জানি কি কেন এসব হচ্ছে?

জানিনা এই কেন কে নিয়ে কেন এতো চিন্তা?
কেন আমি লিখছি কবিতা
কেন প্রশ্নটিকে নিয়ে,
কেন যে দ্যায় কেন মাথা ঘামিয়ে!
কেন প্রশ্ন কেন জবাবহীন?
কেনকে নিয়ে তর্ক করা কেন অর্বাচীন?

Advertisements

ফেভিকলে জোড়া

দুনিয়াটা আজকাল ফেভিকলে জোড়া।
সর্বত্রই কপটতা, ছল চাতুরির চেষ্টা,
মানুষ মানুষের সম্পর্ক — তাতেও সেই কৃত্রিমতা,
কিছুক্ষণ ভিজিলেই আর থাকিবেনা সেই জোড়া।

ভালোবাসা, প্রেম, স্নেহ, মমতা
স্থান নিয়েছে কেবল অভিধানের
লাল হওয়া পৃষ্ঠায়।
এছাড়া তাদের আজ খোঁজ পাওয়া ভার।
সাড়া পৃথিবীতে ঘুরিলে হয়তো পাবে তিন-চার।

আজকাল লোকেদের হাসিতে কষ্ট,
দুইটি কথা বোলতে গেলে
কপালে রেখা হয় স্পষ্ট।

আজকাল যুগে মোরা
সকলেই ফেভিকলের দাস
যতদিন আটকে থাকবে
ততদিনই মোদের সহবাস।

কোন বন্ধনই আটকায়না
ফেভিকল ছাড়া,
মিলন সম্ভব আজি কেবল
ফেভিকলের দ্বারা।
দুনিয়াটা অচল আজি
ফেভিকল ছাড়া,
দুনিয়াটা আজকাল তাই
ফেভিকলে জোড়া।

হিন্দি দিবস

আমাদের রিজনাল ম্যানেজার সাহেব সকালে ভুঁড়ির উপর লাল টাই টেনে সেট করছেন, আর আয়নার দিকে তাকিয়ে বলছে — “ওকে”। চিরুনি বার কর মাথার উপরে যে আঠ-দশটি চুল অবশিষ্ট আছে তাদের উপরে বার কয়েক বুলিয়ে সেট করে নিলেন। টেনেটুনে প্যান্টের উপর বেল্ট বাঁধলেন একটু কষ্ট করে। ভুঁড়িটা যেন কমছেনা। আর কি? সামনে দুই মাসের মধ্যে রিটায়ারমেন্ট। যাই হউক, একটু ফুসফুস করে পারফ্যুম স্প্রে করে নিলেন। আজকে তার শেষ সরকারি অনুষ্ঠান। আজ রাষ্ট্রীয় হিন্দি দিবস।

ড্রাইভারকে ডেকে বললেন — “চলো অফিস। এগারোটার সময় মন্ত্রিজীর  ফ্লাইট এসে পৌঁছাবে।  সাথে হিন্দি অধিকারীকে নিয়ে যেও। পথে ৩০০ টাকা দিয়ে একটা ফুলের স্তবক নিয়ে নিও। নীলিমাকে বলে কম্পিউটার থেকে সুন্দর নামের ব্যানার প্রিন্ট করে নিও। ব্যানার টা তুমি ধর আর স্তবকটা নীলিমাকে দিও।”  আমাদের সাহেব খুব নিয়ম মেনে চলে।

অফিসে ঢুকে এক নজরে পুরো অফিসটা দেখে ঢুকে পড়লেন নিজের ঘরে। সিংহাসনে বিরাজমান হয়ে চা খেতে খেতে হুকুম করলেন নীলিমাকে ডেকে পাঠাবার জন্য।

“নিলিমাজী গুড মর্নিং! আহা, আপনি আজকে ভালো করেছেন — শাড়ি পরে এসেছেন। হিন্দি অধিকারী লাগছেন। অন্যদিন জিনস পরে আসেন হিন্দির থেকে ইংরেজি অফিসার বেশী মনে হয়। আচ্ছা, মন্ত্রীজীর ফ্লাইট ১১টার সময় আসবে। রামু (ড্রাইভার) নিয়ে যাবে। পথে ফুলের স্তবক নিয়ে নিও। ভালো করে অভ্যর্থনা করে নিয়ে এসো। রিপোর্ট যেন ভালো দ্যায়। আমি নিজেই যেতাম, কিন্তু কাছারিতে একটি বিশেষ প্রয়োজনীয় মিটিং আছে। যাই হউক, ভালো করে সব ম্যানেজ করে নিও। আর আজকের অনুষ্ঠানের সব ব্যাবস্থা ঠিক আছে তো?”

“স্যার, এই সাড়ে বারোটার নাগাদ আমাদের অফিসের একটা নিরীক্ষণ করিয়ে দেবো, তার পরে ম্যানেজারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবো। টেবিলে হিন্দি ফাইল সব রাখা আছে … যদি দেখতে চায় তো দেখিয়ে দেবো। দুপুরে ১টা থেকে ২টো অব্দি কনফারেন্স রুমে হিন্দি সভা আছে। আপনি মুখ্য অতিথির পরিচয় এবং সম্মান করবেন, তারপরে ওনার আশীর্বচন শোনা হবে, হিন্দি প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ হবে, তারপরে আপনি আপনার ভাষণ দেবেন। শেষে আমি ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে দেবো। ইতিমধ্যে লাঞ্চের ব্যাবস্থা হয়ে যাবে। সবাই আমরা লাঞ্চ করতে যাবো …”

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আচ্ছা আমাদের অফিসে ওয়িক পয়েন্ট কে কে?”

“ভেঙ্কটেশ জী তো একদম হিন্দি লিখতে পারেন না। একটু একটু পড়ে নেন আর বলে নেন। আর আছেন ভাটিয়া জী। হিন্দি ভালো জানেন, কিন্তু ফাইলে টিপ্পনী ইংরেজিতেই করবেন। কিছুতেই শোনেন না। বাকি স্টাফ ঠিক আছে, স্যার।”

“আচ্ছা, এক কাজ কর — এই দুইজনকে মন্ত্রীজীর হাত দিয়ে দুটো পুরস্কার দিয়ে দিও … যে কোন বাহানা মেরে দিয়ো যে হিন্দির জন্য খুব পরিশ্রম করে, ইত্যাদি। গিফটে কোন পেনের সেট দিয়ে দিও। হ্যাঁ, আমার তো এটা শেষ ভাষণ, তাই কিছু স্পীকিং পয়েন্ট লিখে দাও। বাকি আমি সামলে নেবো।”

মন্ত্রীজী এলেন, অফিসের নিরীক্ষণ হোল, কনফারেন্স রুমে হিন্দি সভা, পুরস্কার বিতরণ আদি সব ভালো ভাবেই, প্ল্যান মাফিক হোল। হিন্দি তে কাজ করার জন্য অভিবাদন দেওয়া হোল, প্রশংসা কারা হোল, আরও বেশী ভাবে কাজ করার জন্য উৎসাহ দেওয়া হোল। নীলিমাজী শেষে আমাদের সাহেবকে দুই শব্দ বলার জন্য অনুরোধ করলেন। সাহেব পেটের বেল্ট টানতে টানতে উঠে হিন্দিতে ভাষণ দিলেন, যার সার হোল —

“মাননীয় মন্ত্রীজী আমাদের দিন ইংরেজী সংবাদপত্রের মাধ্যমে শুরু হয় এবং সন্ধ্যায় টিভি তে ইংরাজী সংবাদে শেষ হয়। এরকম নয় কি কেউ হিন্দী পড়তে পারে না, কিন্তু যদি হিন্দি একটু সরল হতো তবে সম্ভবত একটু দ্রুত পরিবর্তন সম্ভব হতো। আগে, ব্যাংকের সার্কুলারগুলি ইংরেজিতেই প্রকাশিত হতো, তারপর তাদের হিন্দি সংস্করণটি এক মাস পরে আসতো। এখন দুইভাষায় একসঙ্গে আসছে। কিন্তু হিন্দী সার্কুলারের শেষে, একটি লাইন লেখা হয় যে বিতর্কের ক্ষেত্রে ইংরেজির সার্কুলারটি বৈধ হবে। হিন্দি ভাষার প্রচলন বাড়ছে।

মন্ত্রীজী, আরেকটি ঘটনা হল যে জাপানে জাপানী ভাষার অফিসার নেই, রাশিয়ার রাশিয়ান ভাষার অফিসার নেই কিন্তু ভারতে হিন্দি ভাষার অফিসার আছে। এক-দুই জনের কথা বলছিনা, হাজারে হাজারে হিন্দি অধিকারীদের সন্তানরা ইংরেজী মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলিতে অধ্যয়নরত। ঠিক, হিন্দি ভাসার প্রচলন ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হবে।

আমার ইনিংস তো শেষ, আমি পরবর্তী হিন্দী দিবস পালন করতে পারব না। সবার শুভ ও মঙ্গল কামনা করি। ধন্যবাদ।”

সভা শেষ হোল। লাঞ্চ হবার পরে আর কি করা হবে? মন্ত্রীজীর ফ্লাইট তো সন্ধ্যে বেলায়। সময় অনেক আছে। রিজনাল ম্যানেজার সাহেব মন্ত্রীজীকে অনুরোধ করলেন জিমখানা ক্লাবে গিয়ে একটু বিশ্রাম করতে। উনি নিশ্চয়ই এতো কাজের পরে একটু কাহিল হয়ে গেছেন। প্রস্তাবটি মন্ত্রী মহোদয়ের পছন্দ হোল। উনি স্বীকার করে নিলেন। ওখানে বসে আরামে কিছু গল্প হোল বিলিতি মদের সাথে। ধীরে ধীরে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো। ফ্লাইটের সময় হয়ে গেলো।

এয়ারপোর্টে মন্ত্রীজীকে বিদায় দিয়ে এই বছরের হিন্দি দিবস পালন সম্পূর্ণ হোল।

তোমায় দেখিনি কোনদিন

তোমায় দেখিনি আমি কোনদিন
আগে, কে তুমি হে সুন্দরি ,
এ পথ বেয়ে কোথা যাও
শরীরে উঠিয়া লহরি।
কোথা হতে আগমন,
কি তব পরিচয়
কিছুই জানিনা আমি
তবুও করেছো মন জয়।
এক পলকে বিদ্যুতসম
খেলে গেলে আঁখি মাঝে
কোথায় যে উধাও হলে
তব ছবি এঁকে হৃদয় মাঝে।।

সস্তা

“এই নিন দাদু ২১০০০ টাকা।”

“আগের বারে ২৩২৫০ দিলে যে?”

“আরে দাদু সুদ কমেছে খবর রাখেননি? সব জিনিসের দাম কমে যাচ্ছে আর অত টাকা সুদ পাবেন কি করে?”

৭১ বছর বয়সী ভুবনবাবু কাউণ্টার থেকে টাকা গুলো নিয়ে কাঁপা হাতে গুনে নিলেন। নতুন করে মেয়াদি জমা করে  টাকা কম পেয়ে বেশ চিন্তিত। ত্রৈমাসিক ২১০০০ মানে মাসে ৭০০০ টাকায় গুজরান করতে হবে। ১০ লাখ টাকার মেয়াদি জমায়ে ভুবনবাবু আর তার স্ত্রীর সংসার চলে। বাকি ২ লাখ রোগ ভোগের জন্য রাখা। একদা বেসরকারি চাকুরে ভুবনবাবুর সারা জীবনের দুরুহ সঞ্চয় ১২ লাখ। একমাত্র ছেলে বিদেশে স্থিত আর সংসারী নিজের মত।

“দাদু তাড়াতাড়ি করুন লোক দাঁড়িয়ে পেছনে। আর এরপর এটিএম থেকে টাকা তুলবেন নইলে পয়সা কাটবে।”

ক্যাশিয়ারের তাড়ায় তড়িঘড়ি ব্যাংক থেকে বেড়িয়ে এলেন। ৭১ বছরের ভুবন এটিএম-পেটিএম শুনেছেন বটে তবে ব্যাবহারে অক্ষম, কিছুটা ইচ্ছেতেই। মাসে ৭৫০ টাকা কম, কোন খরচা টা ছাঁটবেন ভাবতে ভাবতে নেমে যাওয়া চশমাটা টেনে তুললেন। তার আর স্ত্রী কল্যাণীর ওষুধ খরচাই মাসে তিন হাজার টাকা।

বাজার করবেন আজ ভুবনবাবু। কল্যাণীর রক্তাল্পতা,  মাছ আর ফল কিনতে পারলে ভালো। মাছ বাজারে বিশেষ  আনাগোনা নেই, তবে আশার কথা দাম নাকি কমছে। ধীর পায়ে মাছ বাজারে ঢুকে সাহস করে দোকানীকে শুধোলেন — “কাটা পোনা কত?”

“৩৫০ ওইটা ৪০০ এদিকেরটা। অবজ্ঞা ভরে ব্যাস্ত দোকানী বলল।”

বাপরে, অবাক হলেন ভুবনবাবু। শেষ যেবার এসেছিলেন তখন ছিল ৩০০। দাম তো কমার কথা। ইতস্তত করে বললেন “কিছু কম টম …”

“যান দাদু লোটে খান, এইসব মাছ কম নেই।”

“আমাকে তিন কিলো গাদা পেটি  মিলিয়ে দে। পাশে দাঁড়ানো বারমুডা পড়া ছোকরা বলল লম্বা সাদা সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে।”

গুটি পায়ে ফিরতে গিয়েও কল্যাণীর কথা ভেবে ১০০ টাকা দিয়ে ২৫০ মাছ কিনলেন, ৩ টুকরোতে তিন দিন হবে। অনেকক্ষণ দাঁড়াতে হল ছোট খদ্দের বলে, আঁশ টাও ছাড়াল না।

মাছ নিয়ে রঘুর ফলের দোকানে গেলেন। ওর থেকে মাঝে মধ্যে পুরনো হয়ে যাওয়া ফল কেনেন কিছু সস্তায় — ঠিক পচাও না আবার ভালোও না। কিন্তু  আজ ইচ্ছে আছে একটু ভালো আপেল কেনার। ডাক্তার কল্যাণীকে খেতে বলেছে।

“রঘু আপেল কত রে বাবা, ওই স্টিকার মারা স্যান্ডো পড়া আপেল গুলো।”

“২২০ দাদু। তা তুমি আজ ওটা জিগ্যেস করছ? পাকা পেয়ারা নিয়ে যাও দুটো ১০।

বাপরে! দুমাস আগে আপেল কিনেছিলেন ১৫০ টাকা কিলো। তবে যে ব্যাংকে বলল —

কি আর করা, ৬৬ টাকা দিয়ে দুটো আপেল কিনলেন।

এরপর চালের দোকান, মুদির দোকান, সব্জির দোকান কোথাও গিয়েই ভুবনবাবু ব্যাংকারের কথা মেলাতে পারলেন না। ৪০ এর দুধের সর ৪৫, ২৪ এর আটা ২৬, ১৫ এর লাউ ২৫, ৮০ র মাজন ৮৪, ১০ এর পুজোর ফুল ১৫। ভারি বিব্রত তিনি, মিথ্যাচার করেন না নিজে, পছন্দও করেন না।

বাজার করে আর হেঁটে ফেরার ক্ষমতা নেই। ফেরার পথে ওষুধ কিনবেন বাড়ির কাছেই চারু ফার্মেসি থেকে। একটা রিক্সা চড়ে ওষুধের দোকানে নামলেন। রিক্সাওয়ালাকে গুনে গুনে ১২ টাকা দিলেন, আপশোস হচ্ছে এই টাকাটা ফালতুই গেল, হাতের ব্যাথা টা না থাকলে —

“আরো ২ টাকা দাদু। গত হপ্তা থেকে বেড়েছে, তুমি তো চড় না সেরকম তাই জানোনা”

“তা বাড়লো যে?”

“সব বাড়ছে, আমরা কি হাওয়া খাব?”

ভারি বিব্রত  ভুবন বাবু মাথা নাড়তে নাড়তে আরো ২ টাকা দিলেন। এই ১৪ টাকায় ১৫০ ডাল হয়ে যেত।

চারুর দোকানে ঢুকে বিষণ্ণ চিত্তে বললেন — “বাবা, ওষুধ গুলো দে।”

“এই নাও দাদু। তোমার আর দিদার আলাদা প্যাকেট। ৩৩০০ টাকা।”

ভারি চমকে উঠলেন ভুবনবাবু — ৩০০০ ছিলো তো গত মাসে!

“ডিসকাউন্ট বন্ধ দাদু,  জি-এস-টির জন্য। ওষুধ  পাচ্ছ এই অনেক।”

মাসিক ৩০০ টাকা অতিরিক্ত খরচায় বেজায়ে বিপন্ন হতে হবে তাঁকে। ব্যাথিত চিন্তিত তিনি পা বাড়ালেন রাস্তা পেরোতে।

“আরে দাদু, দেখে রাস্তা পেরোও” — প্রবল হর্ণে ঘাড় ঘুরিয়ে ভুবন বাবু দেখলেন একটা পেল্লাই ঝাঁ চকচকে কালো গাড়ি থেকে মুখ বাড়িয়ে রাজু প্রোমোটার। সানগ্লাসটা চোখ থেকে নামিয়ে এক ছ্যাবড়া লাল থুতু রাস্তায় ফেলে রাজু বলল — “বি এম ডাব্লিউ র ব্রেক বলে বেঁচে গেলে দাদু, নইলে পটল …”

“ভুল হয়ে গেছে বাবা, সত্যি ভাল গাড়ি!”

“খাসা দাদু। দুলাখ টাকা দাম কমেছে বলে নামিয়ে ফেললাম। এবার ফোটো রাস্তা থেকে।”

ভুবনবাবু একটু অবাক হয়ে তড়িঘড়ি রাস্তা পেরোলেন। ব্যাংকার মিথ্যে বলেনি তবে। বিদেশি গাড়ির দাম কমেছে বলে তিনি মাসিক ৭৫০ টাকা কম সুদ পেলেন। একটা কারণ তো পাওয়া গেল।

বাড়ির দরজায় বেল টিপতে কাজের লোক মায়া দরজা খুললো।

“এই যে দাদু এসে গেছ, তোমার জন্যই বসে আছি। ৬০০ এ আর বাসন মাজা আর হপ্তায় একদিন ঘর মোছা হবেনা। ৮০০ লাগবে নইলে গেলাম …”

ভুবন বাবু আর অবাক হলেন না। তিনি জেনে গেছেন কি ধরনের জিনিসের দাম কমেছে।

“তোকে ৮০০ ই দেব। কাজ টা কর মা” — বললেন ভুবনবাবু। তিনি পথ বাতলে ফেলেছেন। তার ওষুধ গুলো না খেলেও চলে পরের মাস থেকে। দেশের উন্নতির শরিক হতে পেরে দুদিন কম বাঁচলেও চলবে তার।

ফেয়ারওয়েল

WhatsApp-এ এই গল্পটা পড়লাম। ভালো লাগলো, তাই এখানে শেয়ার করছি।

দক্ষিণ কলকাতার নামী এই রেঁস্তোরার এক কোনে আজ আনন্দমেলা। সাদা চুল আর ঘোলাটে চোখের বছর সত্তরের এক বৃদ্ধকে ঘিরে ওরা দশজন।অনন্যা শ্বেতা পঞ্চতপা অরণ্য দ্যুতি জয়িতা পিনাক দেবদূত রিমা আর অর্চ্চিস্মান। দামী জামা কাপড়ের মোড়কে বেমানান মানুষটি অবাক হয়ে দেখছে ওদের। ঝকঝকে চেহারার এই ছেলে মেয়েদের মধ্যে খুঁজে বেড়াচ্ছেন ওই শান্ত আর দুষ্টু ছেলে মেয়েগুলোকে।

সেই কতবছর আগেকার কথা! রোজ সকালে বাচ্চা গুলোকে পেছনে বসিয়ে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে আসতেন। সাত সকালে ভ্যানের ভেতরে কেউ ঘুমিয়ে পড়ছে কেউ কাঁদছে কিন্তু ফেরার সময় আবার অন্যরূপ। বিচ্ছুগুলো কখনও মারামারি করছে কখনও ঝগড়া  কখনও ছোট্ট জানলা দিয়ে ঝুলে পড়ছে।রাস্তার লোকেরাও দেখতে পেয়ে কত শাসন করেছে ওদের। ওই দেবদূত ছেলেটা তোএকদিন মাথা ফাটিয়ে কি কান্ড। শেষ পর্যন্ত্য ব্যান্ডেজ করে বাড়ি পৌঁছে দিতে হল।ছোট্ট ফুলের মত জয়িতা ভ্যান রিক্সার মধ্যেই বড় হয়ে গেল একদিন। কত কষ্টে ওই বিচ্ছুগুলোর চোখ বাঁচিয়ে ওর মায়ের কাছে পৌঁছাতে হল। বৃষ্টির সময় ভেজার বায়না আর কড়া রোদে  ভ্যান ঠেলার জন্য কত যে বকাঝকা করতে হয়েছে ওদের! আর ওই দ্যুতি!ওর জন্মদিনে প্রতিবছর নেমন্তন্ন খেতেই হবে।ওই যে অনন্যা ওর বাবা তো প্রতিপূজোয় জামাকাপড় দেবেই।ভগবান  ওদের খুব ভালো করুন।ওই যে মেয়েটা শ্বেতা।  কি রোগাই না ছিল আগে। প্রথমে তো চিনতেই পারিনি। আর  অরণ্যতো কোনদিন ঠিক সময়ে ঘুম থেকে উঠতে পারত না। এত দিন আগের সব যেন ছবির মতো ভাসছে আজ। ওদের পরেও তো প্রতিবছর কত বাচ্চাকে স্কুলে পৌঁছেছে এতদিন ধরে। সবাই কি তাকে মনে রেখেছে!!!

আইডিয়াটা দ্যুতির। ছোট্ট থেকেই বড় ভাবপ্রবন মেয়ে। সেদিন মেট্রো থেকে ফেরার সময় ভ্যানকাকুকে ঠিক চিনতে পেরেছে ও। গল্পেগল্পে ঠিক জেনে নিয়েছে ভ্যানকাকুর জীবন কথা। আগের ভ্যান আর নেই। স্ত্রীর মৃত্যুর সময় বিক্রি হয়ে গেছে। মেয়েরা  নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত।একটাই ছেলেকে একটু হাতের কাজ শিখিয়ে ছিল। সে কাজ শিখে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়েছে। আর আসেনা এখানে। তাই এই বুড়ো বয়সে রিক্সাটাকে ভাড়াদিয়ে নিজের কোনমতে চলে যায়। সেদিন  সারা রাত ভেবেছে দ্যুতি। তারপর একমাত্র অস্ত্র ফেস বুকে খুঁজেছে সবাইকে। ওদের সঙ্গে আবার বন্ধুত্ব করতে ভালো লেগেছে।ছোটবেলার স্মৃতি রোমন্থনে উঠে এসেছে ভ্যানকাকুর কথা। দ্যুতির ভাবনার কথা শুনে  ওরাও যে এভাবে ওকে সাপোর্ট করবে ও ভাবতেই পারেনি।

সবাই মিলে  আলোচনা করে আয়োজন করেছে এই অনুষ্ঠানের। ওদের এই সান্ধ্য অনুষ্ঠানে ওরা আমন্ত্রণ জানিয়েছে আরও একজনকে। এক নাম না জানা দাদু। রোজ ওদের স্কুলে যাবার সময় হাত নেড়ে টা টা করত । পরে জেনেছিল উনি একজন রিটায়ার্ড জজ একদিন সকালে পথ জলে ভেসে যাচ্ছে। আগের দিন রাতে অঝোরে ঝরেছে আকাশ। সেদিন স্কুলে ছিল পরীক্ষা। দাদুর বাড়ির সামনে ভ্যান প্রায় উল্টে যাচ্ছিল। কাকু নিজের কথা না ভেবে কোনও মতে গাড়িটাকে সোজা রাখতে গিয়ে পড়ে যায় জলের মধ্যে। হাত পা কেটে গিয়ে সে কি অবস্থা!এই দাদু তখন ছুটে এসে কাকুর প্রাথমিক চিকিৎসা করেন। এ জন্য ওদের পরীক্ষার সময়ের কোন অসুবিধে হয়নি। ঠিক সময়ে আবার বাড়িতে পৌঁছেও দেয় ওদের। বাড়ির লোকেরা জানতেও পারেনা। প্রতিটি পরীক্ষার রেজাল্ট শীট কাকুকে দেখাতেই হত সবার। কারো ভালো নম্বর দেখে কাকুর চোখে জল দেখেছিল দ্যুতি। তখনকার সেই আবেগকে ওরা বুঝতে পারেনি।কাকু বলেছিল সেই কোন ছেলেবেলায় পড়া ছেড়ে রিক্সা চালাতে আসতে হয়েছে। ছোটবেলায় বড় সখ ছিল পড়াশোনার। কেজানে সেই ভালোলাগা থেকেই বোধ হয় এই স্কুল ভ্যান চালানোর পরিকল্পনা।

গোল হয়ে বসে থাকা সবার মাঝে অরণ্য উঠে দাঁড়ায়। সঞ্চালকের ঢঙে বলতে থাকে ” নমস্কার । আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি একটা ছোট্ট কাজের জন্য। আমাদের ভ্যানকাকু যার নাম আমরা  জেনেছি এতবছর পরে সেই শ্রী পরান বারুইকে কিছু উপহার দিতে চাই। এই খামে আছে দু লক্ষ টাকার চেক।   অল্পদিনের চাকরীর সামান্য সঞ্চয় থেকে আমরা এইটুকুর ব্যবস্থা করেছি।   সামান্য টাকার বিনিময়ে  রোজ ঝড় জল উপেক্ষা করে যে ছিল  আমাদের শৈশবের সঙ্গী সেই ভ্যানকাকুর রিক্সাচালক জীবনের অবসরে আমাদের আন্তরিক উপহার। ” এই বলে খামটি দাদুর হাতে দেয়।  আজীবন দোষীদের শাস্তি দিতে দিতে মানুষের উপর  বিশ্বাস হারানো মানুষটি নির্বাক চেয়ে থাকে নতুন প্রজন্মের দিকে। আবার নতুনকরে বাঁচবার সাধ জাগে।ওই সত্তরোর্ধ মানুষটির চোখে নোনা জলের বন্যা । আনন্দের  না কান্নার!!! বাইরে গোধূলির  ম্লান আলো আর ঘরের ভেতরে দশটি মোবাইলের ফ্ল্যাশের আলোয় চকচক করছে দুই বৃদ্ধের জলেভরা চোখ। দশ জন তখন ভীষণ ব্যাস্ত কে দেবে আগে আপডেট্…….!!!!!

হাই-টি মিটিং

তখন আমাদের রিজনাল ম্যানেজার গোয়েল সাহেব নিজের কেবিনে বসে ফাইল সই করছেন। সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। বাড়ী যাবার সময় হয়ে এসেছে। ড্রাইভারকে তলব করা হয়ে গেছে। এমন সময় ফোন বাজে। জোনাল অফিস থেকে। ফোন করেছে জোনাল ম্যানেজারের P.A.। জোনাল ম্যানেজার সাহেব আগামী কাল ভিজিটে আসছেন। রিজনাল অফিসে পোঁছাতে প্রায় বিকেল ৪টে বেজে যাবে। ফোন পেয়েই গোয়েল সাহেব ব্যস্ত হয়রে পড়লেন, আমাদের সবাইকে ডেকে খবরটা দিলেন। আর প্রস্তুতির আদেশ, সেটা বলা বাহুল্য। শহরের সব ম্যানেজারদেরকে জানানো হোল। কাল বিকেলে তারাও যেন আসে। মিটিং হবে।

কিন্তু একটু সমস্যা হয়ে গিয়েছে। P.A. সাহেব জানিয়েছে বিকেলে সাহেব পৌঁছানোর পরে হাই-টির  ব্যবস্থা  করতে। আমাদের ছোট শহরে এই রকম ব্যাবস্থা মুশকিল। গোয়েল সাহেব আবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করলেন হাই-টিতে কি ব্যবস্থা করা যেতে পারে। সে জানালো চায়ের সাথে কাজু, সিঙ্গারা, পেস্ট্রি ইত্যাদি। জোনাল ম্যানেজার আমাদের সবার বার্ষিক সমীক্ষা অনুমোদন করেন। তাকে তো খুশী করতেই হবে। সবাই মিলে কালকের মেনু ঠিক করা হোল — চা, কাজু, শিঙ্গাড়া আর বিস্কুট। আমাদের এই ছোট শহরে পেস্ট্রি পাওয়া যায় না। কেক কেটে পেস্ট্রি করার আইডিয়াটা অবশ্য মাথুর সাহেব দিয়েছিলেন।

সাক্সেনাজী বললেন এখানের ইয়াসিনের কাবাব খুব বিখ্যাত। আর বিকেলে তাজা বানায়। জোনাল ম্যানেজার যখন আমিষ খান, তখন ওই কাবাব মেনুতে রাখা যেতে পারে। ইয়াসিনের কাবাবের নামে আমাদের অনেকের মুখে জল এসে গেছে, তাই মেনুতে কাবাব জুড়ে দেওয়া হোল।

পরের দিন পুরো রিজনাল অফিস পরিষ্কার করা হোল, বাইরে কোন ফালতু কাগজ বা ফাইল নেই। রিজনের পারফরমান্স রিপোর্ট তৈরি হোল পাওয়ারপয়েন্ট-এ। গোয়েল সাহেব নিজেই বার বার দেখছেন আর চার্টগুলো এদিক-ওদিক থেকে সমন্বয় করার চেষ্টা করছেন যাতে দেখতে ভালো লাগে। যথারীতি বিকেল চারটের নাগাদ বড়ো সাহেব এসে পোঁছালেন। পড়ে সাড়ে পাঁচটার থেকে সব ম্যানেজারদের সাথে মিটিং করবেন হাই-টিতে। ভাটিয়াজির উপরে সব আয়োজনের দায়িত্ব। ভাটিয়াজি খুব উদ্দীপনা নিয়ে ব্যবস্থা করেন।

আমরা সকলে দৈনিক কাজ মোটামুটি শেষ করে মিটিঙের জন্য প্রস্তুত। আজকে কাজের থেকে বেশী জোনাল ম্যানেজারের আগমন নিয়ে প্রস্তুতি আর চর্চাটাই বেশী হয়েছে, সেটা বলা বাহুল্য। রিজনের পারফরমান্স দেখে বড়ো সাহেব খুশী হয়েছেন। তবুও ডিপোজিট, লোণ ইত্যাদি বিষয় টিপ্পনী করেছেন। সেতো আমরা জানি সব মিটিঙে এইরকম হয়। তারপর পরিশ্রমের উপর বক্তৃতা। ইতিমধ্যে চা, কাজু, শিঙ্গাড়া, বিস্কুট এসে গেলো আর সাথে সাথে এলো ইয়াসিন ভাইয়ের কাবাব! সবাই খুব আনন্দ করে খাচ্ছে আর কথা হচ্ছে। জোনাল ম্যানেজার কাবাব খেয়ে খুব খুশী, বললেন “সত্যি খুব স্বাদিস্ট।” গোয়েল সাহেব নিজে নিরামিষাশী কিন্তু বড়ো সাহেব খুশী বলে উনিও খুশী। ভাটিয়াজিকে প্রশিংসা করলেন আর সাক্সেনাজিকেও — এই কাবাবের আইডিয়া দেবার জন্য।

মিটিং তখন শেষ, সবাই খুশী। কিন্তু কথার ছলে শর্মাজী হটাৎ করে বলে বসলেন যে উনি মাংস খান না তবে নাকি শুনেছেন যে ইয়াসিন ভাইয়ের কাবাবে বীফ — মানে মহিষের মাংস — থাকে। তাই বলে সবাই বলে নাকি বেশী সুস্বাদু! বলা মাত্রই উনি নিজের ভুল বুঝেছেন, কিন্তু কথা একবার মুখ থেকে বের হলে আর ফেরৎ আসেনা। কথা যতই সঠিক হউক না কেন ভুল জায়গায় সেটি হয় মারাত্মক। সেই জন্য কোন কথা বলার আগে স্থান, কাল, পাত্র বিবেচনা করা খুবই প্রয়োজন। শর্মাজীর কথা শুনে পুরো ঘর নিঃশব্দ হয়ে গেলো। কারোর মুখে আর কথা নেই, হাসির রেশমাত্র উড়ে গেলো। গোয়েল সাহেবের মুখ রক্তিম বর্ণ হয়ে গেছে — লজ্জায় না রাগে, জানিনা।

ভাটিয়াজীর সামনে প্রোমোশন, এক মাস পরে ইন্টার্ভিউ। ধপ করে বসে পড়লেন চেয়ারে, গেলো এবার তার প্রোমোশন হাতছাড়া হয়ে। সাক্সেনাজী কোনায় দাঁড়িয়ে মাথা পিটছে, আর বলছে বিড়বিড় করে — “কেন যে কাবাবের আইডিয়া দিতে গেলাম”। সাক্সেনাজী লোণ ডিপার্টমেন্টের ম্যানেজার। বলছেন কাল জোনাল ম্যানেজার ফিরে গিয়ে কোন খারাপ লোণের কেসের উপর তাকে না মেমো দেন।

ধীরে-ধীরে আমরা সবাই চুপচাপ মাথা গুঁজে, আগামী দিনের আসন্ন বিপদের সম্ভাবনার কথা চিন্তা করতে করতে বাড়ী ফিরে গেলাম। আমাদের সবার বার্ষিক কার্য্য-সমীক্ষা জোনাল ম্যানেজারের হাতে। এবার কি জানি কি হবে!